আপনার পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা কীভাবে খুঁজে পাবেন?

আপনার পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা কীভাবে খুঁজে পাবেন?

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

 

মো. জয়নাল আবদিন
ব্যবসা পরামর্শক | উদ্যোক্তা | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (টিঅ্যান্ডআইবি)
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)

 

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলেও পাট ও বহুমুখী পাটপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, গৃহসজ্জা বস্ত্র, হস্তশিল্প, সিরামিক পণ্য, কৃষি ও কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত খাদ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, আসবাবপত্র, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং আরও অনেক খাতে বাংলাদেশের রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একজন নতুন রপ্তানিকারকের জন্য ভালো পণ্য উৎপাদন অথবা সংগ্রহ করা পুরো কাজের মাত্র একটি অংশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:

আপনার পণ্য কিনতে আগ্রহী, সক্ষম এবং প্রকৃত আন্তর্জাতিক ক্রেতা কীভাবে খুঁজে পাবেন?

 

বাংলাদেশে হাজার হাজার উদ্যোক্তার কাছে রপ্তানিযোগ্য পণ্য রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় তারা রপ্তানি শুরু করতে পারেন না। তারা জানেন না কোথায় ক্রেতা খুঁজতে হবে, কাকে যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে প্রথম যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে মূল্য প্রস্তাব দিতে হবে, ক্রেতার সত্যতা কীভাবে যাচাই করতে হবে এবং একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানকে কীভাবে প্রকৃত রপ্তানি আদেশে রূপান্তর করতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজা মানে শুধু অন্তর্জাল থেকে হাজার হাজার বৈদ্যুতিন ডাকের ঠিকানা সংগ্রহ করে একই বার্তা পাঠানো নয়। সফল রপ্তানি বিপণনের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি প্রস্তুতি, সঠিক পণ্য নির্বাচন, বাজার গবেষণা, উপযুক্ত ক্রেতার ধরন নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকা তৈরি, পেশাদার যোগাযোগ, ক্রেতা যাচাই, নমুনা পাঠানো, দর-কষাকষি, নথিপত্র প্রস্তুত, নিরাপদ মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থা, পণ্য প্রেরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই নির্দেশিকায় পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে একজন নতুন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজা থেকে শুরু করে একটি টেকসই রপ্তানি ব্যবসা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন।

 

১. প্রথমে রপ্তানি ব্যবসার কাঠামো বুঝুন

আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজা শুরু করার আগে একটি রপ্তানি লেনদেন সাধারণত কীভাবে পরিচালিত হয় তা বুঝতে হবে। সহজভাবে একটি রপ্তানি লেনদেনের কাঠামো হতে পারে:

বাংলাদেশি রপ্তানিকারক → আন্তর্জাতিক আমদানিকারক → পরিবেশক বা পাইকার → খুচরা বিক্রেতা → চূড়ান্ত ভোক্তা

 

তবে পণ্যের ধরন ও বাজারভেদে এই সরবরাহ কাঠামো ভিন্ন হতে পারে। আপনার আন্তর্জাতিক ক্রেতা হতে পারেন:

  • আমদানিকারক
  • পাইকার
  • পরিবেশক
  • খুচরা বিক্রেতা
  • বৃহৎ বিপণিবিতান
  • পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান
  • ক্রয় প্রতিষ্ঠান
  • শিল্পকারখানা
  • নিজস্ব নামে পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান
  • অন্তর্জালভিত্তিক বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
  • হোটেল ও রেস্তোরাঁ সরবরাহকারী
  • সরকারি ক্রয় প্রতিষ্ঠান
  • প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা

 

আপনার পণ্য সাধারণত কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান আমদানি করে—এই বিষয়টি বুঝতে পারাই আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজার প্রথম ভিত্তি।

 

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি পাটের কেনাকাটার ব্যাগ তৈরি করেন, তাহলে সাধারণ আমদানিকারকদের কাছে নির্বিচারে যোগাযোগ না করে পরিবেশবান্ধব মোড়ক, পাটপণ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ অথবা টেকসই পণ্য আমদানিকারকদের খুঁজে বের করা বেশি কার্যকর হবে।

আপনি যদি হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করেন, তাহলে সামুদ্রিক খাদ্য আমদানিকারক, পরিবেশক, হোটেল-রেস্তোরাঁ সরবরাহকারী এবং বৃহৎ বিপণিবিতানের ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান আপনার সম্ভাব্য ক্রেতা হতে পারে। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পোশাকের নামী প্রতিষ্ঠান, পাইকার, পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক এবং ক্রয় প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ক্রেতা হতে পারে।

 

অতএব, প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়: বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোথায় খুঁজে পাব?” বরং প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: আমার নির্দিষ্ট পণ্য সাধারণত কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান কেনে?”

 

২. ক্রেতা খোঁজার আগে নিজেকে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করুন

নতুন রপ্তানিকারকদের একটি সাধারণ ভুল হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক প্রচার শুরু করা, কিন্তু সম্ভাব্য ক্রেতার অনুসন্ধানের উত্তর দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত না রাখা। ধরা যাক, আপনি পাঁচশ সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং একজন বড় আমদানিকারক উত্তর দিলেন: “আপনার পণ্যের বিবরণী, কারখানা থেকে জাহাজে তোলা পর্যন্ত মূল্য, সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ, মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা, মান সনদ এবং নমুনা প্রস্তুতের সময়সীমা পাঠান।”

 

আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে পেশাদারভাবে এসব তথ্য দিতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে আপনি এখনো পুরোপুরি রপ্তানির জন্য প্রস্তুত নন।

 

২.১ ব্যবসার আইনগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন

পণ্যের ধরন ও ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী একজন রপ্তানিকারকের প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধন, কর ও মূল্য সংযোজন করসংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যাংক হিসাব, রপ্তানিসংক্রান্ত নিবন্ধন এবং পণ্যভিত্তিক অনুমতি বা সনদ থাকতে পারে। রপ্তানি শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, অনুমোদিত ব্যাংক, শুল্ক প্রতিনিধি এবং পরিবহনসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে আলোচনা করে আপনার পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র ও অনুমতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

 

সাধারণভাবে রপ্তানি কার্যক্রমে প্রয়োজন হতে পারে:

  • ব্যবসায়িক নিবন্ধন
  • কর শনাক্তকরণসংক্রান্ত নথি
  • মূল্য সংযোজন করসংক্রান্ত নিবন্ধন
  • রপ্তানিকারক নিবন্ধন
  • অনুমোদিত ব্যাংক হিসাব
  • বাণিজ্যিক চালান
  • মোড়ক তালিকা
  • রপ্তানি ঘোষণা
  • উৎপত্তি সনদ
  • পরিবহন নথি
  • পণ্যভেদে বিশেষ অনুমোদন বা সনদ

 

২.২ আপনার রপ্তানিযোগ্য পণ্য নির্ধারণ করুন

সবকিছু রপ্তানি করার চেষ্টা করবেন না। একটি নির্দিষ্ট পণ্য অথবা পরস্পর সম্পর্কিত কয়েকটি পণ্যের শ্রেণি নির্বাচন করুন। আপনার জানা থাকা উচিত:

  • পণ্যের নাম
  • পণ্যের শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস
  • কাঁচামাল
  • পণ্যের পূর্ণ বিবরণ
  • আকার ও মাপ
  • নকশা
  • উৎপাদন সক্ষমতা
  • সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ
  • মোড়কজাতকরণের ধরন
  • প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংরক্ষণকাল
  • মান সনদ
  • উৎপাদন ও সরবরাহের সময়
  • ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগ
  • উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা

 

নিজের পণ্য সম্পর্কে একজন রপ্তানিকারকের জ্ঞান অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া উচিত।

 

২.৩ পেশাদার বিপণন উপকরণ প্রস্তুত করুন

আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের আগে অন্তত নিম্নোক্ত উপকরণ প্রস্তুত রাখুন।

প্রতিষ্ঠান পরিচিতি

আপনার প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, উৎপাদন অথবা পণ্য সংগ্রহের সক্ষমতা, অবকাঠামো, বর্তমান বাজার, মান সনদ, কর্মী, উৎপাদন সুবিধা এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সংক্ষেপে তুলে ধরুন।

 

পণ্য বিবরণী

উন্নতমানের ছবি, পণ্যের বৈশিষ্ট্য, উপকরণ, মাপ, মোড়ক, পণ্য নম্বর এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগ উল্লেখ করুন।

 

পেশাদার অন্তর্জালভিত্তিক পরিচিতি

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার আগে সাধারণত অন্তর্জালে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অনুসন্ধান করেন। তাই আপনার প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, পণ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, যোগাযোগের ঠিকানা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।

 

প্রাতিষ্ঠানিক বৈদ্যুতিন ডাক

প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নামযুক্ত বৈদ্যুতিন ডাকের ঠিকানা সাধারণ বিনামূল্যের ঠিকানার তুলনায় অধিক পেশাদার ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

 

ডিজিটাল উপস্থিতি

প্রাসঙ্গিক পেশাজীবী যোগাযোগমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্য উপস্থিতি বজায় রাখুন।

 

কারখানা ও উৎপাদনের ছবি

কারখানা, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, মোড়কজাতকরণ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রকৃত ছবি ও চলমান দৃশ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

 

৩. আপনার পণ্যের স্বতন্ত্র বিক্রয় বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করুন

একজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রস্তাব পেতে পারেন। তাহলে তিনি আপনার কাছ থেকে কেন কিনবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই হলো আপনার স্বতন্ত্র বিক্রয় বৈশিষ্ট্য

 

আপনার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হতে পারে:

  • প্রতিযোগিতামূলক মূল্য
  • নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা
  • কম পরিমাণে প্রাথমিক আদেশ গ্রহণ
  • দ্রুত সরবরাহ
  • হাতে তৈরি পণ্য
  • পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল
  • জৈব উপাদান
  • ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন
  • ক্রেতার নিজস্ব নামে পণ্য উৎপাদন
  • নমনীয় মোড়ক ব্যবস্থা
  • আন্তর্জাতিক মান সনদ
  • পণ্যে নতুনত্ব
  • নৈতিক উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ
  • আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের অভিজ্ঞতা

 

“আমরা সর্বনিম্ন মূল্যে সর্বোচ্চ মানের পণ্য সরবরাহ করি” এ ধরনের সাধারণ বক্তব্য এড়িয়ে চলুন। কারণ প্রায় সব সরবরাহকারী একই কথা বলে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সুবিধা তুলে ধরুন।

 

উদাহরণ: আমরা ক্রেতার নিজস্ব নাম নকশায় পাটের কেনাকাটার ব্যাগ উৎপাদন করি এবং তুলনামূলক কম পরিমাণের প্রাথমিক আদেশও গ্রহণ করি।” এ ধরনের বক্তব্য সম্ভাব্য ক্রেতাকে দ্রুত আপনার সক্ষমতা বুঝতে সাহায্য করবে।

 

৪. সঠিক রপ্তানি বাজার নির্বাচন করুন

একসঙ্গে সব দেশকে লক্ষ্য করবেন না। কয়েকটি অগ্রাধিকার বাজার নির্ধারণ করলে আন্তর্জাতিক বিপণন অনেক বেশি কার্যকর হয়। ধরা যাক, আপনি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদন করেন। একশ দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছে বার্তা পাঠানোর পরিবর্তে প্রথমে পাঁচটি সম্ভাবনাময় বাজার গবেষণা করুন এবং সেখান থেকে সবচেয়ে উপযোগী দুই বা তিনটি বাজার নির্বাচন করুন।

 

৪.১ বাজারে পণ্যের চাহিদা বিশ্লেষণ করুন

গবেষণা করুন:

  • মোট আমদানি মূল্য
  • আমদানি বৃদ্ধির হার
  • প্রধান সরবরাহকারী দেশ
  • গড় আমদানি মূল্য
  • ভোক্তার চাহিদা
  • প্রতিযোগিতা
  • বাজারের আকার
  • সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি দেশ আপনার পণ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি করে কি না তা জানা যায়।

 

৪.২ আমদানি বিধিবিধান সম্পর্কে জানুন

কোনো দেশে পণ্যের চাহিদা বেশি হলেও সেখানে কঠিন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থাকতে পারে। জেনে নিন:

  • আমদানি শুল্ক
  • মূল্য সংযোজন কর
  • পণ্যের মান
  • মোড়কসংক্রান্ত নিয়ম
  • পণ্যের গায়ে তথ্য লেখার নিয়ম
  • খাদ্য নিরাপত্তা
  • পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা
  • নিবন্ধন
  • স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যবস্থা
  • উৎপত্তির বিধান

 

এসব বিষয় সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা না থাকলে ক্রেতা পাওয়ার পরও রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

 

৪.৩ পরিবহন ব্যয়ের বাস্তবতা যাচাই করুন

কারখানা পর্যায়ে আপনার পণ্য প্রতিযোগিতামূলক হলেও পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হওয়ার পর তা ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে।

 

হিসাব করুন: কারখানা মূল্য + অভ্যন্তরীণ পরিবহন + বন্দর ব্যয় + আন্তর্জাতিক পরিবহন + বিমা + আমদানি শুল্ক + গন্তব্যের অন্যান্য ব্যয় = ক্রেতার মোট ব্যয়

 

ক্রেতার কাছে আপনার পণ্যের প্রকৃত বাণিজ্যিক গ্রহণযোগ্যতা এই মোট ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।

আপনার পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা কীভাবে খুঁজে পাবেন?
আপনার পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা কীভাবে খুঁজে পাবেন?

৫. আদর্শ ক্রেতার পরিচিতি তৈরি করুন

ক্রেতার তালিকা তৈরির আগে ঠিক করুন আপনি কাদের খুঁজছেন। উদাহরণ:

পণ্য: পাটের কেনাকাটার ব্যাগ
লক্ষ্য বাজার: জার্মানি
ক্রেতার ধরন: আমদানিকারক, পরিবেশবান্ধব মোড়ক পরিবেশক ও খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান
আদেশের আকার: মাঝারি থেকে বড়
ক্রেতার চাহিদা: নিজস্ব নামে পণ্য তৈরির সুবিধা
যোগাযোগের ব্যক্তি: ক্রয় ব্যবস্থাপক, আমদানি ব্যবস্থাপক অথবা পণ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপক

এটি আপনার আদর্শ ক্রেতার পরিচিতি

 

এরপর আপনার অনুসন্ধান হবে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট।

 

৬. অনুসন্ধান ব্যবস্থা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করুন

অন্তর্জালের অনুসন্ধান ব্যবস্থা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজার অন্যতম সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। শুধু “জার্মানিতে ক্রেতা” লিখে অনুসন্ধান করবেন না। এর পরিবর্তে পণ্যভিত্তিক অনুসন্ধান করুন।

 

যেমন:

  • জার্মানিতে পাটের ব্যাগ আমদানিকারক
  • জার্মানিতে পাটপণ্য পরিবেশক
  • জার্মানিতে পরিবেশবান্ধব মোড়ক পাইকার
  • ফ্রান্সে গৃহসজ্জা বস্ত্র আমদানিকারক
  • সংযুক্ত আরব আমিরাতে হিমায়িত খাদ্য পরিবেশক
  • ইতালিতে চামড়াজাত পণ্য আমদানিকারক
  • ব্রাজিলে পোশাক পাইকার
  • যুক্তরাষ্ট্রে সিরামিক টেবিল সামগ্রী পরিবেশক

 

অনুসন্ধানে পণ্যের নাম, দেশ এবং ক্রেতার ধরন একত্রে ব্যবহার করুন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্জালভিত্তিক পরিচিতি খুলে যাচাই করুন তারা সত্যিই আপনার পণ্য নিয়ে ব্যবসা করে কি না।

 

৭. পেশাজীবী যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী খুঁজুন

পেশাজীবী যোগাযোগমাধ্যমের বড় সুবিধা হলো এখানে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, প্রতিষ্ঠানের ক্রয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকেও শনাক্ত করা যায়। ধরা যাক, আপনি একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছেন।

 

এখন সেই প্রতিষ্ঠানে নিম্নোক্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজুন:

  • ক্রয় ব্যবস্থাপক
  • আমদানি ব্যবস্থাপক
  • পণ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপক
  • পণ্যশ্রেণি ব্যবস্থাপক
  • সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপক
  • ক্রয় পরিচালক
  • প্রধান ক্রয় কর্মকর্তা
  • বাণিজ্যিক পরিচালক
  • ব্যবস্থাপনা পরিচালক

 

সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত করা বার্তা পাঠানো সাধারণ ঠিকানায় একই ধরনের বার্তা পাঠানোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। আপনার নিজের পেশাজীবী পরিচিতিও যথেষ্ট পেশাদার হতে হবে। সেখানে আপনার প্রতিষ্ঠান, পণ্যের ধরন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং লক্ষ্য বাজার পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন।

 

৮. অন্তর্জালভিত্তিক ব্যবসায়িক বাজার ব্যবহার করুন

আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক বাজারগুলো সরবরাহকারীকে আমদানিকারক, পাইকার ও ব্যবসায়িক ক্রেতাদের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে। তবে শুধু একটি হিসাব খুললেই ক্রেতা পাওয়া যাবে, এমন ধারণা ভুল।

 

একটি শক্তিশালী সরবরাহকারী পরিচিতিতে থাকতে হবে:

  • প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য
  • উন্নতমানের পণ্যের ছবি
  • সঠিক পণ্য বিবরণ
  • সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ
  • উৎপাদন সক্ষমতা
  • মান সনদ
  • মোড়কসংক্রান্ত তথ্য
  • রপ্তানি অভিজ্ঞতা
  • দ্রুত অনুসন্ধানের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো অনুসন্ধান পাওয়ার পর অর্থ, নমুনা বা অন্যান্য সম্পদ ব্যয় করার আগে সম্ভাব্য ক্রেতার সত্যতা যাচাই করা।

 

৯. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করুন

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা প্রকৃত ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার অন্যতম কার্যকর উপায়। আপনি অংশ নিতে পারেন:

  • প্রদর্শক হিসেবে
  • দর্শনার্থী হিসেবে
  • ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে
  • পৃষ্ঠপোষক হিসেবে
  • ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠকের অংশগ্রহণকারী হিসেবে

 

মেলায় যাওয়ার আগেই সম্ভব হলে প্রদর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের তালিকা সংগ্রহ করুন। প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে গবেষণা করুন এবং আগাম বৈঠকের সময় নির্ধারণের চেষ্টা করুন। শুধু মেলায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করাকে কার্যকর আন্তর্জাতিক বিপণন বলা যায় না।

 

সঠিক পদ্ধতি হলো:

মেলার আগে ক্রেতা শনাক্তকরণ → যোগাযোগ → বৈঠক নির্ধারণ → মেলায় সাক্ষাৎ → পরবর্তী যোগাযোগ

 

সঙ্গে রাখুন:

  • ব্যবসায়িক পরিচয়পত্র
  • পণ্য বিবরণী
  • পণ্যের নমুনা
  • প্রাথমিক মূল্যতালিকা
  • প্রতিষ্ঠান পরিচিতি
  • ডিজিটাল তথ্য দেখার সহজ ব্যবস্থা

 

মেলা শেষে কয়েক কর্মদিবসের মধ্যে যোগাযোগ করুন।

 

১০. বাণিজ্য মিশন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণ করুন

সরকারি সংস্থা, বাণিজ্য সংগঠন ও ব্যবসায়িক চেম্বার বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল এবং ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠকের আয়োজন করে থাকে। নতুন রপ্তানিকারকদের জন্য এগুলো বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

 

এ ধরনের কর্মসূচিতে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে:

  • আমদানিকারক
  • পরিবেশক
  • বাণিজ্য চেম্বার
  • ব্যবসায়িক সংগঠন
  • সরকারি সংস্থা
  • সম্ভাব্য অংশীদার

 

শুধু বিদেশ ভ্রমণ করাই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি সফরের আগে নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করুন।

 

১১. বাণিজ্য চেম্বার খাতভিত্তিক সংগঠন ব্যবহার করুন

বাণিজ্য চেম্বার এবং শিল্প ও ব্যবসায়িক সংগঠন বাজার সম্পর্কে তথ্য ও ব্যবসায়িক পরিচিতি পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। খুঁজুন:

  • জাতীয় বাণিজ্য চেম্বার
  • দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চেম্বার
  • আমদানিকারক সংগঠন
  • পাইকার সংগঠন
  • খুচরা বিক্রেতা সংগঠন
  • খাতভিত্তিক শিল্প সংগঠন

 

ধরা যাক, আপনি একটি নির্দিষ্ট দেশে জুতা রপ্তানি করতে চান।

 

হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান খোঁজার পরিবর্তে সেই দেশের জুতা আমদানিকারক, পরিবেশক অথবা খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন শনাক্ত করুন। একটি সংগঠনের সদস্য তালিকাতেই আপনার জন্য কয়েক ডজন বা কয়েকশ সম্ভাব্য ক্রেতা থাকতে পারে।

 

১২. দূতাবাসের বাণিজ্যিক শাখার সহায়তা নিন

বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও বাণিজ্যিক কার্যালয় এবং বাংলাদেশে বিদেশি দূতাবাসের বাণিজ্যিক শাখা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাজারসংক্রান্ত তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ অথবা ব্যবসায়িক সংগঠনের পরিচিতি দিতে পারে। যোগাযোগের সময় একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল পরিচিতি প্রস্তুত করুন।

 

উল্লেখ করুন:

  • প্রতিষ্ঠানের নাম
  • পণ্য
  • পণ্যের শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস
  • বর্তমান রপ্তানি বাজার
  • লক্ষ্য দেশ
  • কী ধরনের ক্রেতা প্রয়োজন
  • প্রতিষ্ঠানের অন্তর্জালভিত্তিক ঠিকানা
  • পণ্য বিবরণীর সংযোগ
  • যোগাযোগের তথ্য

 

শুধু “আমাকে কিছু ক্রেতার ঠিকানা দিন” এ ধরনের অস্পষ্ট অনুরোধ করবেন না। আপনি ঠিক কী ধরনের ব্যবসায়িক সংযোগ চান তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন।

টিঅ্যান্ডআইবি-এর সমন্বিত ব্যবসা প্রচার ও বাজার সম্প্রসারণ সেবা
টিঅ্যান্ডআইবি-এর সমন্বিত ব্যবসা প্রচার ও বাজার সম্প্রসারণ সেবা

১৩. আমদানি তথ্য শুল্কসংক্রান্ত বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণ করুন

আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগুলোর একটি হলো ইতোমধ্যে আপনার মতো পণ্য আমদানি করছে এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা। বাজার ও তথ্যের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে আমদানি ও পণ্য চালানের তথ্য থেকে জানা যেতে পারে:

  • আমদানিকারকের নাম
  • রপ্তানিকারকের নাম
  • পণ্যের বিবরণ
  • আমদানির নিয়মিততা
  • পরিমাণ
  • উৎপত্তি দেশ
  • গন্তব্য
  • বন্দরসংক্রান্ত তথ্য

 

এভাবে আপনি কল্পিত সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে প্রকৃত সক্রিয় আমদানিকারক শনাক্ত করতে পারবেন।

 

উদাহরণস্বরূপ, আপনার পণ্যের শুল্ক শ্রেণির আওতায় গত এক বছরে একটি দেশে পঞ্চাশটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে থাকলে সেই পঞ্চাশ প্রতিষ্ঠান আপনার জন্য পাঁচ হাজার সাধারণ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি মূল্যবান সম্ভাব্য ক্রেতা।

 

১৪. পাইকারি খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থা গবেষণা করুন

লক্ষ্য দেশের নিম্নোক্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করুন:

  • বৃহৎ বিপণিবিতান
  • বিশেষায়িত দোকান
  • পাইকারি প্রতিষ্ঠান
  • খুচরা বিক্রয় শৃঙ্খল
  • অন্তর্জালভিত্তিক খুচরা বিক্রেতা
  • শিল্পপণ্য পরিবেশক

 

তাদের বর্তমানে বিক্রি করা পণ্যগুলো দেখুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন:

  • তারা কি আমার মতো পণ্য বিক্রি করছে?
  • তারা কোন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে?
  • তাদের নিজস্ব নামে পণ্য আছে কি?
  • ক্রয়ের দায়িত্বে কে আছেন?
  • বাংলাদেশ কি প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প হতে পারে?

 

এভাবে সাধারণ ক্রেতা অনুসন্ধান একটি পরিকল্পিত বাজার প্রবেশ গবেষণায় পরিণত হয়।

 

১৫. সম্ভাব্য ক্রেতার তথ্যভান্ডার তৈরি করুন

আন্তর্জাতিক সম্ভাব্য ক্রেতার তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বৈদ্যুতিন ডাক ও ব্যবসায়িক পরিচয়পত্রে রাখবেন না। একটি সুসংগঠিত তথ্যভান্ডার তৈরি করুন। নিম্নোক্ত তথ্য রাখুন:

 

বিষয় সংরক্ষণযোগ্য তথ্য
প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নাম
দেশ লক্ষ্য বাজার
অন্তর্জাল ঠিকানা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা
ক্রেতার ধরন আমদানিকারক, পরিবেশক বা খুচরা বিক্রেতা
যোগাযোগের ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর নাম
পদবি ক্রয়, আমদানি বা সংগ্রহসংক্রান্ত পদ
বৈদ্যুতিন ডাক যাচাইকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা
দূরভাষ যোগাযোগ নম্বর
আগ্রহের পণ্য সংশ্লিষ্ট পণ্য
তথ্যের উৎস অনুসন্ধান, মেলা, চেম্বার, পরিচিতি
প্রথম যোগাযোগ তারিখ
পরবর্তী যোগাযোগ পরবর্তী পদক্ষেপের তারিখ
অবস্থা সম্ভাব্য ক্রেতা, অনুসন্ধান, নমুনা, দর-কষাকষি, আদেশ

পরিমাণের চেয়ে মানের ওপর গুরুত্ব দিন।

 

সঠিকভাবে গবেষণা করা একশ সম্ভাব্য ক্রেতা অনেক সময় দশ হাজার এলোমেলো বৈদ্যুতিন ডাকের ঠিকানার চেয়ে বেশি মূল্যবান।

 

১৬. ব্যবসা শুরুর আগে ক্রেতা যাচাই করুন

ক্রেতা পাওয়া এবং প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্য ক্রেতা পাওয়া এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে। তাই যথাযথ যাচাই অপরিহার্য। যাচাই করুন:

  • প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন
  • প্রকৃত কার্যালয়ের ঠিকানা
  • প্রতিষ্ঠানের অন্তর্জাল ঠিকানা
  • প্রাতিষ্ঠানিক বৈদ্যুতিন ডাক
  • পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা
  • ব্যবসার বয়স
  • আমদানির ইতিহাস
  • ব্যবসায়িক সুপারিশ
  • চেম্বার বা সংগঠনের সদস্যপদ
  • ঋণযোগ্যতা
  • ব্যবসায়িক সুনাম
  • ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য

 

বিশেষ সতর্ক থাকুন যদি কোনো ব্যক্তি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দাবি করেন কিন্তু শুধুমাত্র বিনামূল্যের বৈদ্যুতিন ডাক ব্যবহার করেন, দৃশ্যসংযোগে বৈঠক করতে না চান, অস্বাভাবিক অগ্রিম ফি চান, হঠাৎ ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন করেন অথবা প্রথম লেনদেনেই অবাস্তব বড় আদেশ দিতে চান। বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে পেশাদার বাণিজ্যিক যাচাই সেবা নেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

 

১৭. কার্যকর প্রথম যোগাযোগ বার্তা লিখুন

প্রথম বার্তাটি সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার এবং ক্রেতাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত। প্রথম বার্তায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস লিখবেন না। একটি কার্যকর বার্তার কাঠামো হতে পারে:

 

বিষয়: বাংলাদেশ থেকে [পণ্যের নাম] সরবরাহ — [মূল বিশেষ সুবিধা]

 

এরপর সংক্ষেপে লিখুন:

১. আপনি কে
২. কী উৎপাদন বা রপ্তানি করেন
৩. কেন পণ্যটি ওই ক্রেতার জন্য প্রাসঙ্গিক
৪. আপনার প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা
৫. ক্রেতার কাছ থেকে কী পদক্ষেপ আশা করছেন

 

“সম্মানিত মহোদয়, আমরা বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের পণ্যের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক” এ ধরনের সাধারণ বক্তব্য এড়িয়ে চলুন।

 

সম্ভব হলে ক্রেতার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় উল্লেখ করুন। ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত করা বার্তা আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

 

১৮. পেশাদারভাবে পরবর্তী যোগাযোগ করুন

অনেক রপ্তানিকারক একবার বার্তা পাঠিয়ে আর যোগাযোগ করেন না। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ব্যস্ত থাকেন। উত্তর না দেওয়া সব সময় প্রত্যাখ্যান বোঝায় না। একটি সাধারণ যোগাযোগ ধারাবাহিকতা হতে পারে:

 

প্রথম দিন: পরিচিতিমূলক বার্তা
চার থেকে সাত দিনের মধ্যে: প্রথম অনুস্মারক
দশ থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে: দ্বিতীয় অনুস্মারক
পরবর্তী সময়ে: নতুন ও কার্যকর তথ্যসহ যোগাযোগ

 

প্রতিবার একই বার্তা পাঠাবেন না। পরবর্তী যোগাযোগে দিতে পারেন:

  • নতুন পণ্য
  • হালনাগাদ পণ্য বিবরণী
  • নমুনার সুযোগ
  • নতুন মান সনদ
  • নতুন মোড়ক
  • উৎপাদন সক্ষমতার তথ্য
  • বাণিজ্য মেলায় সাক্ষাতের প্রস্তাব

 

পেশাদার ধারাবাহিকতা কার্যকর। বিরক্তিকর বার্তা পাঠানো কার্যকর নয়।

টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরিতে আপনার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করার শীর্ষ ১০টি সুবিধা
টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরিতে আপনার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করার শীর্ষ ১০টি সুবিধা

১৯. ক্রেতার অনুসন্ধানের সঠিক উত্তর দিন

ক্রেতা উত্তর দেওয়ার পর দ্রুত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কারভাবে উত্তর দিন:

  • পণ্যের বৈশিষ্ট্য
  • সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ
  • মূল্য
  • সরবরাহের বাণিজ্যিক শর্ত
  • উৎপাদন সক্ষমতা
  • উৎপাদন ও সরবরাহের সময়
  • মোড়ক
  • মান সনদ
  • নমুনার নিয়ম
  • মূল্য পরিশোধের শর্ত
  • পণ্য প্রেরণের বন্দর

 

কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না এবং অস্পষ্ট উত্তর দেবেন না। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা অনুসন্ধান পর্যায়ে সরবরাহকারীর যোগাযোগের মান দেখেই ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্যতা বিচার করেন।

 

২০. পেশাদার রপ্তানি মূল্য প্রস্তাব প্রস্তুত করুন

আপনার মূল্য প্রস্তাবে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন:

  • পণ্যের নাম
  • পণ্যের বৈশিষ্ট্য
  • পরিমাণ
  • একক মূল্য
  • মুদ্রা
  • সরবরাহের শর্ত
  • বন্দর
  • সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ
  • মোড়ক
  • উৎপাদন ও সরবরাহের সময়
  • মূল্য পরিশোধের শর্ত
  • প্রস্তাবের মেয়াদ
  • নমুনার শর্ত

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরবরাহ শর্ত ভালোভাবে বুঝতে হবে।

 

কারখানা থেকে সরবরাহ

এই ব্যবস্থায় বিক্রেতার প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান থেকে পণ্য গ্রহণের পর অধিকাংশ পরিবহন দায়িত্ব ক্রেতা বহন করেন।

 

জাহাজে তোলা পর্যন্ত সরবরাহ

বিক্রেতা নির্ধারিত বন্দরে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য জাহাজে তোলা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

 

ভাড়াসহ গন্তব্য বন্দরে সরবরাহ

বিক্রেতা নির্ধারিত গন্তব্য বন্দর পর্যন্ত পরিবহন ভাড়া বহন করেন।

 

ভাড়া ও বিমাসহ গন্তব্য বন্দরে সরবরাহ

বিক্রেতা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরিবহন ভাড়া ও বিমার ব্যবস্থা করেন।

 

মূল্য প্রস্তাব ও চুক্তিতে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিয়ম সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।

 

২১. নমুনা পাঠানোর প্রক্রিয়া কৌশলগতভাবে পরিচালনা করুন

অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক আদেশ দেওয়ার আগে ক্রেতা নমুনা দেখতে চান। নমুনার মাধ্যমে ক্রেতা যাচাই করতে পারেন:

  • মান
  • উপকরণ
  • মাপ
  • বাহ্যিক সমাপ্তি
  • রং
  • মোড়ক
  • ব্যবহারযোগ্যতা
  • নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য

 

আগেই পরিষ্কার করুন:

  • নমুনার মূল্য
  • দ্রুত পরিবহন ব্যয়
  • নমুনা তৈরির সময়
  • বিশেষ নকশার নমুনার খরচ
  • প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নমুনা খরচ ফেরতের নীতি

 

প্রতিটি পাঠানো নমুনার তথ্য সংরক্ষণ করুন।

 

নমুনা পৌঁছানোর পর জিজ্ঞাসা করুন: আপনারা কি নমুনাটি মূল্যায়ন করেছেন? অনুগ্রহ করে আপনাদের মতামত এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন জানাবেন।” নমুনা পাঠানোর উদ্দেশ্য শুধু পণ্য পাঠানো নয়। উদ্দেশ্য হলো ক্রেতাকে বাণিজ্যিক আদেশের দিকে এগিয়ে নেওয়া।

 

২২. লাভের সীমা নষ্ট না করে দর-কষাকষি করুন

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রায়ই মূল্য নিয়ে দর-কষাকষি করেন। দর-কষাকষির আগে হিসাব করুন:

  • সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মূল্য
  • উৎপাদন ব্যয়
  • মোড়ক ব্যয়
  • অভ্যন্তরীণ পরিবহন
  • নথিপত্রের ব্যয়
  • ব্যাংক ব্যয়
  • মধ্যস্থতার খরচ
  • আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়
  • লাভের হার
  • বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি

 

চাপের মুখে নির্বিচারে মূল্য কমাবেন না। মূল্য ছাড়কে ব্যবসায়িক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করুন। উদাহরণ: আদেশের পরিমাণ পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার এককে উন্নীত হলে আমরা একক মূল্য পুনর্বিবেচনা করতে পারি।”

 

এতে আপনার লাভের সীমা রক্ষা হবে এবং ক্রেতাকে বড় আদেশ দিতে উৎসাহিত করা যাবে।

 

২৩. নিরাপদ মূল্য পরিশোধের শর্ত নির্ধারণ করুন

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মূল্য পরিশোধের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ব্যবস্থা হতে পারে:

  • অগ্রিম মূল্য পরিশোধ
  • ঋণপত্র
  • নথির বিপরীতে মূল্য সংগ্রহ
  • বাকিতে বাণিজ্য
  • আংশিক অগ্রিম এবং অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ

 

কোন ব্যবস্থা উপযুক্ত হবে তা নির্ভর করে:

  • ক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা
  • পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক সম্পর্ক
  • আদেশের আকার
  • দেশের ঝুঁকি
  • ব্যাংকিং ব্যবস্থা
  • দর-কষাকষিতে উভয় পক্ষের অবস্থান

 

সম্পূর্ণ নতুন ক্রেতাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাকির সুবিধা দেবেন না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অনুমোদিত ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করুন।

 

২৪. আনুষ্ঠানিক ক্রয়াদেশ অথবা চুক্তি গ্রহণ করুন

শুধু অনানুষ্ঠানিক বার্তার ভিত্তিতে বড় পরিমাণের পণ্য উৎপাদন শুরু করবেন না। উপযুক্ত ক্রয়াদেশ অথবা চুক্তি সংগ্রহ করুন।

 

যাচাই করুন:

  • ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম
  • পণ্যের নাম
  • বৈশিষ্ট্য
  • পরিমাণ
  • মূল্য
  • মুদ্রা
  • সরবরাহের শর্ত
  • সরবরাহের তারিখ
  • মোড়ক
  • পরিদর্শন
  • মূল্য পরিশোধ
  • পরিবহন নথি
  • অভিযোগ নিষ্পত্তি
  • অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত

 

কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে উৎপাদন শুরুর আগেই সমাধান করুন।

business mentor

২৫. রপ্তানি নথিপত্র সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা রাখুন

ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর রপ্তানি নথিপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে:

  • রপ্তানি ঘোষণা
  • ক্রয়াদেশ অথবা বিক্রয় চুক্তি
  • বাণিজ্যিক চালান
  • মোড়ক তালিকা
  • বিস্তারিত মোড়ক তালিকা
  • রপ্তানিসংক্রান্ত ব্যাংক নথি
  • উৎপত্তি সনদ
  • পরিবহন নথি

 

পণ্য ও গন্তব্যভেদে অতিরিক্ত নথি লাগতে পারে:

  • উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সনদ
  • স্বাস্থ্য সনদ
  • প্রাণিস্বাস্থ্য সনদ
  • মান সনদ
  • পরিদর্শন সনদ
  • জীবাণুমুক্তকরণ সনদ
  • হালাল সনদ
  • বিমা নথি
  • পণ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রক অনুমোদন

 

পণ্য, শুল্ক শ্রেণি এবং গন্তব্য দেশভেদে প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে। তাই পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পরে নয়, চালান প্রস্তুতের আগেই সব প্রয়োজনীয়তা যাচাই করুন।

 

২৬. উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করুন

ক্রয়াদেশ পাওয়া বিক্রয় প্রক্রিয়ার শেষ নয়। এটি বাস্তবায়নের শুরু। একটি সাধারণ প্রক্রিয়া হতে পারে:

ক্রয়াদেশ → উৎপাদন পরিকল্পনা → কাঁচামাল সংগ্রহ → উৎপাদন → মান পরীক্ষা → মোড়কজাতকরণ → চূড়ান্ত পরিদর্শন → পণ্য প্রেরণ

 

পণ্যের মান অবশ্যই অনুমোদিত নমুনা ও ক্রেতার নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একটি নিম্নমানের চালান কয়েক মাস ধরে তৈরি করা ক্রেতা সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।

লিখিত মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরি করুন এবং পরিদর্শনের তথ্য সংরক্ষণ করুন।

 

২৭. পরিবহন শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা করুন

পরিবহন পদ্ধতি নির্বাচন করুন নিম্নোক্ত বিষয় বিবেচনা করে:

  • পণ্যের ধরন
  • পরিমাণ
  • ওজন
  • আয়তন
  • গন্তব্য
  • সরবরাহের সময়সীমা
  • ব্যয়

 

প্রচলিত পরিবহন পদ্ধতি:

  • সমুদ্রপথ
  • আকাশপথ
  • স্থলপথ
  • ছোট নমুনার জন্য দ্রুত বার্তাবাহী পরিবহন

 

বিশ্বস্ত পরিবহন প্রতিষ্ঠান, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠান এবং শুল্ক ছাড়কারী পেশাজীবীর সঙ্গে কাজ করুন। রপ্তানি ঘোষণা অনুমোদন, প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পণ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর পণ্য জাহাজীকরণ ও রপ্তানির পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

 

২৮. রপ্তানি মূল্য দেশে আনা এবং ব্যাংকিং নিয়ম অনুসরণ করুন

রপ্তানি মূল্য গ্রহণকে অনানুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে দেখবেন না। অনুমোদিত ব্যাংকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করুন, যাতে:

  • রপ্তানি নথিপত্র সঠিক থাকে
  • বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে
  • মূল্য আদায়ের তথ্য সংরক্ষিত হয়
  • বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করা হয়

 

প্রতিটি রপ্তানি লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ নথি সংরক্ষণ করুন।

 

২৯. প্রথম আদেশকে পুনরাবৃত্ত ব্যবসায় পরিণত করুন

সবচেয়ে লাভজনক ক্রেতা অনেক সময় নতুন ক্রেতা নন। বরং একজন সন্তুষ্ট পুরোনো ক্রেতাই সবচেয়ে মূল্যবান। পণ্য সরবরাহের পর:

  • পণ্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করুন
  • পণ্যের মান সম্পর্কে মতামত নিন
  • অভিযোগ দ্রুত সমাধান করুন
  • ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে জানুন
  • নতুন পণ্যের তথ্য দিন
  • উন্নয়নের প্রস্তাব দিন
  • পরবর্তী আদেশ নিয়ে আলোচনা করুন
  • নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখুন

 

আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত:

সম্ভাব্য ক্রেতা → অনুসন্ধান → নমুনা → পরীক্ষামূলক আদেশ → পুনরায় আদেশ → নিয়মিত ক্রেতা → দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদার

 

এভাবেই একটি টেকসই রপ্তানি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়।

 

৩০. বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সাধারণ ভুল

নতুন রপ্তানিকারকদের কিছু সাধারণ ভুল বারবার দেখা যায়।

 

নির্বিচারে বিপুলসংখ্যক বার্তা পাঠানো: হাজার হাজার সাধারণ বার্তা সাধারণত ভালো ফল দেয় না।

ভালো পদ্ধতি: লক্ষ্যভিত্তিক সম্ভাব্য ক্রেতার তথ্যভান্ডার তৈরি করুন।

সব দেশকে একসঙ্গে লক্ষ্য করা: এতে সময় ও অর্থ অপচয় হয়।

ভালো পদ্ধতি: কয়েকটি অগ্রাধিকার বাজার নির্বাচন করুন।

শুধু মূল্য দিয়ে প্রতিযোগিতা করা: আপনার চেয়ে কম দামের সরবরাহকারী সব সময়ই থাকতে পারে।

ভালো পদ্ধতি: মান, নির্ভরযোগ্যতা, নমনীয়তা, সেবা ও অতিরিক্ত সুবিধা বিক্রি করুন।

ক্রেতা যাচাই না করা: বড় আদেশ আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু সেটি প্রতারণাও হতে পারে।

ভালো পদ্ধতি: বাণিজ্যিক যাচাই সম্পন্ন করুন।

খুব দ্রুত বাকির সুবিধা দেওয়া: নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জরুরি।

ভালো পদ্ধতি: নিরাপদ মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থা নির্ধারণ করুন।

যোগাযোগে দেরি করা: একজন ক্রেতা একই সময়ে একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

ভালো পদ্ধতি: দ্রুত ও পেশাদারভাবে উত্তর দিন।

দুর্বল বিপণন উপকরণ: নিম্নমানের ছবি ও অসম্পূর্ণ পণ্য বিবরণী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা কমায়।

ভালো পদ্ধতি: পেশাদার উপস্থাপনায় বিনিয়োগ করুন।

গন্তব্য দেশের বিধিবিধান উপেক্ষা করা: বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় পণ্যও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।

ভালো পদ্ধতি: আদেশ গ্রহণের আগেই সব নিয়ম গবেষণা করুন।

digital marketing

৩১. আন্তর্জাতিক ক্রেতা পাওয়ার নব্বই দিনের বাস্তব কর্মপরিকল্পনা

একজন নতুন বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রথম তিন মাসকে নিম্নোক্তভাবে সাজাতে পারেন।

 

প্রথম থেকে পনেরো দিন: রপ্তানি প্রস্তুতি

চূড়ান্ত করুন:

  • পণ্য নির্বাচন
  • শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস
  • প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র
  • রপ্তানিসংক্রান্ত নিবন্ধন
  • পণ্যের বৈশিষ্ট্য
  • সর্বনিম্ন ক্রয় পরিমাণ
  • উৎপাদন সক্ষমতা
  • মূল্য কাঠামো

 

ষোলো থেকে ত্রিশ দিন: বিপণন প্রস্তুতি

প্রস্তুত করুন:

  • প্রতিষ্ঠানের অন্তর্জালভিত্তিক পরিচিতি
  • প্রতিষ্ঠান পরিচিতি
  • পণ্য বিবরণী
  • পেশাদার পণ্যের ছবি
  • প্রাতিষ্ঠানিক বৈদ্যুতিন ডাক
  • পেশাজীবী পরিচিতি
  • মূল্য প্রস্তাবের নমুনা
  • নমুনা সরবরাহ নীতি

 

একত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ দিন: বাজার গবেষণা

তিন থেকে পাঁচটি বাজার নির্বাচন করুন।

 

বিশ্লেষণ করুন:

  • আমদানি চাহিদা
  • প্রতিযোগিতা
  • শুল্ক
  • বিধিবিধান
  • পরিবহন
  • ক্রেতার ধরন

 

তারপর সবচেয়ে উপযুক্ত বাজারগুলো নির্বাচন করুন।

 

ছেচল্লিশ থেকে ষাট দিন: ক্রেতা গবেষণা

প্রায় একশ থেকে দুইশ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সম্ভাব্য ক্রেতার তথ্যভান্ডার তৈরি করুন।

 

সংগ্রহ করুন:

  • প্রতিষ্ঠানের নাম
  • অন্তর্জাল ঠিকানা
  • যোগাযোগের ব্যক্তি
  • পদবি
  • বৈদ্যুতিন ডাক
  • দূরভাষ
  • ক্রেতার ধরন
  • প্রয়োজনীয় মন্তব্য

 

একষট্টি থেকে পঁচাত্তর দিন: যোগাযোগ

সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন:

  • ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত বৈদ্যুতিন ডাক
  • পেশাজীবী যোগাযোগমাধ্যম
  • বাণিজ্য চেম্বার
  • শিল্প সংগঠন
  • ব্যবসায়িক বাজার
  • বাণিজ্য মেলার যোগাযোগ

 

প্রতিটি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করুন।

 

ছিয়াত্তর থেকে নব্বই দিন: ক্রেতাকে আদেশে রূপান্তর

গুরুত্ব দিন:

  • পরবর্তী যোগাযোগ
  • দৃশ্যসংযোগে ব্যবসায়িক বৈঠক
  • মূল্য প্রস্তাব
  • নমুনা
  • দর-কষাকষি
  • ক্রেতা যাচাই
  • পরীক্ষামূলক আদেশ

 

নব্বই দিন শেষে বিশ্লেষণ করুন কোন দেশ, কোন ধরনের ক্রেতা এবং কোন যোগাযোগ পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে।

 

এরপর সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্রগুলোতে বেশি সময় ও সম্পদ বিনিয়োগ করুন।

 

৩২. আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগ্রহের পূর্ণাঙ্গ ধাপ

একজন পেশাদার রপ্তানিকারকের আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগ্রহ প্রক্রিয়া হওয়া উচিত:

পণ্য নির্বাচন

রপ্তানি প্রস্তুতি

বাজার গবেষণা

লক্ষ্য দেশ নির্বাচন

আদর্শ ক্রেতার পরিচিতি নির্ধারণ

সম্ভাব্য ক্রেতার তথ্যভান্ডার তৈরি

ক্রেতা যাচাই

প্রথম যোগাযোগ

পরবর্তী যোগাযোগ

ক্রেতার অনুসন্ধান

ব্যবসায়িক বৈঠক

মূল্য প্রস্তাব

নমুনা

দর-কষাকষি

ক্রয়াদেশ অথবা চুক্তি

মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা

উৎপাদন

মান নিয়ন্ত্রণ

রপ্তানি নথিপত্র

পণ্য প্রেরণ

রপ্তানি মূল্য আদায়

বিক্রয়োত্তর সেবা

পুনরায় আদেশ

 

এই প্রক্রিয়াই একজন অচেনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক ক্রেতায় রূপান্তর করার পূর্ণাঙ্গ পথ।

 

উপসংহার

আন্তর্জাতিক ক্রেতা পাওয়া কোনো জাদু বা ভাগ্যের বিষয় নয়। এটি একটি পরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং পেশাদার ব্যবসা উন্নয়ন প্রক্রিয়া। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য এই যাত্রা শুরু হওয়া উচিত নিজেদের রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যমে। এরপর সঠিক পণ্য নির্বাচন, পণ্যের শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস ও নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা বোঝা, সম্ভাবনাময় বাজার গবেষণা এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান সেই পণ্য কেনে তা নির্ধারণ করতে হবে।

 

পরবর্তী ধাপে পরিকল্পিতভাবে সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজতে হবে অন্তর্জালভিত্তিক অনুসন্ধান, পেশাজীবী যোগাযোগমাধ্যম, ব্যবসায়িক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল, বাণিজ্য চেম্বার, শিল্প সংগঠন, দূতাবাসের বাণিজ্যিক শাখা, আমদানি তথ্যভান্ডার, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু শুধু ক্রেতার নাম ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়।

 

একজন সফল রপ্তানিকারককে সম্ভাব্য ক্রেতার সত্যতা যাচাই করতে হবে, পেশাদারভাবে যোগাযোগ করতে হবে, নিয়মিত পরবর্তী যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে, সঠিক মূল্য প্রস্তাব দিতে হবে, নমুনা ব্যবস্থাপনা করতে হবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে, নিরাপদ মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে এবং উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, নথিপত্র ও পণ্য প্রেরণ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রপ্তানি বিপণনের সাফল্য শুধু কতটি বার্তা পাঠানো হয়েছে তা দিয়ে পরিমাপ করবেন না।

 

সাফল্য পরিমাপ করুন এভাবে:

যোগ্য সম্ভাব্য ক্রেতা শনাক্ত → ক্রেতার উত্তর → ব্যবসায়িক বৈঠক → অনুসন্ধান → নমুনা → মূল্য প্রস্তাব → পরীক্ষামূলক আদেশ → পুনরায় আদেশ

 

একজন নতুন রপ্তানিকারক প্রথম দশটি প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেই আদেশ নাও পেতে পারেন। এটি স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় সফল হতে গবেষণা, ধারাবাহিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক রপ্তানিযোগ্য পণ্য রয়েছে। যেসব উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতামূলক পণ্যের সঙ্গে পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগ্রহের কৌশল যুক্ত করতে পারবেন, তারা ধীরে ধীরে একটি টেকসই রপ্তানি ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

 

মূল নীতিটি অত্যন্ত সহজ:

আন্তর্জাতিক ক্রেতা নিজে থেকে আপনার প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন না। সঠিক বাজার নির্বাচন করুন, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে খুঁজে বের করুন, পেশাদারভাবে যোগাযোগ করুন, নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিন, প্রথম আদেশ সফলভাবে সম্পন্ন করুন এবং সেই প্রথম লেনদেনকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কে রূপান্তর করুন।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these