শহীদ শরীফ ওসমান হাদী

শহীদ শরীফ ওসমান হাদী

মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)

 

শরীফ ওসমান হাদী (১৯৯৩–২০২৫) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত যুব আন্দোলনকর্মী ও সাংস্কৃতিক নেতা, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে তাঁর ভূমিকার জন্য মৃত্যুর পর “শহীদ” হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

ইনকিলাব মঞ্চ-এর (বিপ্লবী প্ল্যাটফর্ম) সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র হিসেবে হাদী গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং যুব ক্ষমতায়নের পক্ষে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর হত্যাকাণ্ড সারা দেশে গণবিক্ষোভ ও তীব্র অস্থিরতার জন্ম দেয় এবং তাঁকে প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের এক স্থায়ী প্রতীকে পরিণত করে।

 

শৈশব

শরীফ ওসমান হাদীর জন্ম ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়।

তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হাদী ছিলেন একজন সম্মানিত মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম এবং তাঁর মাতা তাসলিমা হাদী ছিলেন একজন গৃহিণী।

তিনি ছিলেন ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
শৈশবকাল থেকেই তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক সচেতনতার পরিচয় দেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততার ভিত্তি গড়ে তোলে।

 

শিক্ষাজীবন

শরীফ ওসমান হাদী তাঁর শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি ঝালকাঠি এন. এস. কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। ২০১০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনে তিনি সক্রিয়ভাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তাঁর লেখা বাংলা কাব্যগ্রন্থ পূর্ব আকাশ লাল অমরান্তে রাঙা” প্রকাশিত হয়।

এই বহুমাত্রিক বৌদ্ধিক চর্চা তাঁকে একজন দক্ষ বক্তা ও চিন্তাশীল নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।

শহীদ শরীফ ওসমান হাদী

পেশাগত জীবন

সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার আগে শরীফ ওসমান হাদী একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স-এর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি স্নাতক পর্যায়ে ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয় পড়াতেন এবং একই সঙ্গে লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন। তিনি কমিউনিটি শিক্ষা কার্যক্রমেও স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

এই শিক্ষকতা ও সংগঠক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

 

রাজনৈতিক জীবন

জুলাই আন্দোলনের পর শরীফ ওসমান হাদী বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির একজন প্রভাবশালী মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে “ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র” গঠনের অঙ্গীকার করেন এবং সব ধরনের আধিপত্যের বিরোধিতা করেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শে প্রবল জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় দেখা যায়। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে “ফ্যাসিবাদ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দলটিকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।

তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ সব বিরোধী শক্তিকে একত্রিত হয়ে “জাতীয় সরকার” গঠনের আহ্বান জানান। দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার অবস্থান তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।

 

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে তাঁর ভূমিকা

শরীফ ওসমান হাদী ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। তিনি ঢাকার রামপুরা এলাকায় অবস্থান করে আন্দোলনের স্থানীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছাত্রসমাবেশ সংগঠিত করেন, মিছিলের নেতৃত্ব দেন এবং আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচার দাবি করেন। আন্দোলনের পর তিনি “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং শহীদ ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে অব্যাহত প্রচারণা চালান।

এই ভূমিকার মাধ্যমেই তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত এক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

 

তাঁর ভারতবিরোধী অবস্থান

শরীফ ওসমান হাদীর রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে “ভারতীয় আধিপত্য” থেকে মুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখতেন। তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকার ভারতের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে ছিল। তিনি বাংলাদেশকে একটি “ন্যায়ভিত্তিক সার্বভৌম রাষ্ট্র” হিসেবে গড়ে তুলতে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিসমূহ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

এমনকি তিনি বিতর্কিত “গ্রেটার বাংলাদেশ” মানচিত্র প্রচার করেন, যা তাঁর কট্টর জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে স্পষ্ট করে। মৃত্যুর পর তাঁর সংগঠন ঘোষণা করে, “ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামে আল্লাহ মহান বিপ্লবী ওসমান হাদীকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।”

Osman Hadi

Osman Hadi

তাঁর জনপ্রিয় বার্তা

নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়েছে, মানুষের বুক চিরে দেওয়া হয়েছে।”

 

চরমপন্থার সমালোচনায় তিনি বলেন, “আমরা বিচার চাই না, আমরা ফাঁসি চাই, এই মানসিকতাই আমাদের ধ্বংস করেছে।”

 

জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “এই রায় পুরো বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”

 

সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামে আল্লাহ ওসমান হাদীকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।”

 

তাঁর হত্যাকাণ্ড

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্দুকধারী তাঁর মাথায় গুলি করে। গুলিতে তাঁর ব্রেন স্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুলিশ হামলার সঙ্গে জড়িত দুইজনকে শনাক্ত করে এবং জানায় যে প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি ভারতে পালিয়ে গেছে।

 

তাঁর চিকিৎসা

ওসমান হাদী

ওসমান হাদী

ঢাকায় জরুরি অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, গুলিটি তাঁর মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এবং অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

 

তাঁর মৃত্যু

সব ধরনের চিকিৎসা প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন।

সরকারিভাবে তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়।
অন্তর্বর্তী প্রধান উপদেষ্টা একে “জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি” বলে আখ্যায়িত করেন।

 

তাঁর নামাজে জানাজা

হাদি

২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দশ লাখেরও বেশি মানুষ, রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র, সাধারণ নাগরিক, জানাজায় অংশ নেন। অন্তর্বর্তী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানাজায় ইমামতি করেন এবং তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে দাফন করা হয়।

 

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা

শরীফ ওসমান হাদীর জীবন প্রমাণ করে যে তরুণদের নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। তিনি ভয়হীনভাবে সত্য উচ্চারণ করেছেন এবং ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করেননি।

তাঁর জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়।

 

সমাপনী মন্তব্য

শরীফ ওসমান হাদীর শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে।
তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের এই শহীদ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্বাধীনতা, সাহস ও আত্মমর্যাদার পথে অনুপ্রাণিত করে যাবেন।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *