বাংলাদেশে ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ: উদ্যোক্তাদের প্রকৃতপক্ষে কী প্রয়োজন?
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ
সম্পাদক, টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরি; নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল ব্যবসায়িক অর্থনীতির একটি দেশ, যেখানে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এমএসএমই) বাণিজ্য, উৎপাদন, সেবা, কৃষিভিত্তিক ভ্যালু চেইন এবং দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে “একটি ব্যবসা শুরু করা” এবং “একটি স্কেলযোগ্য, নিয়ম-অনুগত, ব্যাংকযোগ্য ও রপ্তানি-উপযোগী ব্যবসা গড়ে তোলা” এই দুই পর্যায়ের মধ্যকার ব্যবধান এখনো বেশ বড়। এই ব্যবধান পূরণ করতেই ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ একটি বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিলাসিতা হিসেবে নয়।
ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেমের তথ্যও এই প্রয়োজনীয়তাকে সমর্থন করে। বাংলাদেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখে বলে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়, এবং জাতীয় নীতিমালায় এই অবদান আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে, স্টার্টআপ খাতে মূলধনের বাস্তবতা দেখায় যে প্রবৃদ্ধি তহবিল কতটা কেন্দ্রীভূত ও প্রতিযোগিতামূলক—২০২৫ সালে মোট স্টার্টআপ বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মাত্র কয়েকটি চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর অর্থ হলো, অধিকাংশ উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব পাওয়ার জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে হয়।
ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ উদ্যোক্তাদের সেই ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে গঠনমূলক দিকনির্দেশনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং দায়বদ্ধতার মাধ্যমে যাতে প্রবৃদ্ধি পরিকল্পিত ও পরিমাপযোগ্য হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবসায়িক বাস্তবতায় মেন্টরশিপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সাধারণত একই সঙ্গে তিনটি বড় চাপে কাজ করেন।
প্রথমত, বাজারের চাপ। প্রতিযোগিতা তীব্র, ক্রেতার প্রত্যাশা বাড়ছে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পণ্য ও সেবা খোঁজার প্রবণতা ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে ব্র্যান্ডিং, গ্রাহক অভিজ্ঞতা, মূল্য নির্ধারণ এবং বিতরণ ব্যবস্থায় উন্নতি করতে হয়, পাশাপাশি লাভের মার্জিনও রক্ষা করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, কমপ্লায়েন্স ও ঝুঁকির চাপ। ট্রেড লাইসেন্স, কর ও ভ্যাট, শ্রম ও নিরাপত্তা বিধি, চুক্তি ও ডকুমেন্টেশন এসব টেকসই ব্যবসার জন্য অপরিহার্য, বিশেষ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, উন্নয়ন প্রকল্প, বিদেশি ক্রেতা বা রপ্তানি বাজারের সঙ্গে কাজ করতে হলে।
তৃতীয়ত, অর্থায়নের চাপ। স্বল্পমূল্যের কার্যকর মূলধন ও প্রবৃদ্ধি অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নির্ভর করে স্বচ্ছ হিসাব, ব্যাংকযোগ্য প্রজেকশন এবং ব্যবসায়িক শৃঙ্খলার ওপর। অনেক প্রতিষ্ঠান লাভজনক হলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থায়নের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। মেন্টরশিপ উদ্যোক্তার উদ্যম এবং পরিচালনাগত পরিপক্বতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।
উদ্যোক্তাদের প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যবসায়িক মেন্টরের কাছ থেকে কী প্রয়োজন?
একজন মেন্টরের কাজ শুধু অনুপ্রেরণা দেওয়া নয়। প্রকৃত মেন্টরশিপ উদ্যোক্তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একটি কার্যকর সিস্টেমে রূপান্তর করে কৌশল, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং উন্নয়নের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন মেন্টরশিপ ফলাফলগুলো সাধারণত নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে কেন্দ্রীভূত।
১) বাস্তবতার সঙ্গে টিকে থাকে এমন সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা
উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান নির্ধারণ কে তাদের আদর্শ গ্রাহক, কোন পণ্য বা সেবা প্রকৃতপক্ষে সফল, কীভাবে ব্যবসা আলাদা পরিচয় তৈরি করছে এবং কোন প্রবৃদ্ধির পথ বাস্তবসম্মত। একজন মেন্টর দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যবহারিক রোডম্যাপে রূপান্তর করেন, যেখানে অগ্রাধিকার, সময়সূচি ও কর্মক্ষমতার সূচক নির্ধারিত থাকে।
২) আর্থিক স্বচ্ছতা: মুনাফা আর নগদ প্রবাহ এক নয়
অনেক ছোট ব্যবসা সম্প্রসারণের সময় ভেঙে পড়ে, কারণ নগদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মেন্টরশিপ এখানে সহায়তা করে মূল্য নির্ধারণ ও মার্জিন নিয়ন্ত্রণ, নগদ প্রবাহ পরিকল্পনা, কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনা, ব্যয় পর্যবেক্ষণ, ব্রেক-ইভেন বিশ্লেষণ এবং ঋণ ও অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণে। এসব কাঠামো তৈরি হলে ব্যবসা আরও স্থিতিশীল ও ব্যাংকযোগ্য হয়ে ওঠে।
৩) শক্তিশালী অপারেশন ও মানসম্মত প্রক্রিয়া
ব্যবসা বড় হলে “মালিকনির্ভর পরিচালনা” থেকে বেরিয়ে আসতে হয় এবং পুনরাবৃত্তিযোগ্য সিস্টেম গড়ে তুলতে হয় ক্রয়, ইনভেন্টরি, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, সেবা প্রদান, গ্রাহক সহায়তা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ রিপোর্টিং। মেন্টরশিপ এসব ক্ষেত্রে এসওপি, দায়িত্ব বণ্টন এবং পারফরম্যান্স রুটিন তৈরি করতে সহায়তা করে।
৪) আধুনিক মার্কেটিং ও বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি
আজকের উদ্যোক্তাদের জন্য পণ্যের মানের পাশাপাশি বাজারে প্রবেশাধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর মেন্টরশিপ সহায়তা করে বি-টু-বি ক্লায়েন্ট অর্জন কৌশল, অংশীদারিত্ব ও চ্যানেল উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং পরিকল্পনা, লিড পাইপলাইন ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক ধরে রাখার কৌশল গঠনে।
৫) রপ্তানি প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য মেন্টরশিপে থাকতে হয় রপ্তানি ডকুমেন্টেশন ও কমপ্লায়েন্স প্রস্তুতি, লক্ষ্য বাজার বিশ্লেষণ, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও দরপত্র কাঠামো, প্যাকেজিং ও মান নির্ধারণ এবং বি-টু-বি ম্যাচমেকিং কৌশল। অনেক সক্ষম উৎপাদক এখানেই পিছিয়ে পড়ে, কারণ রপ্তানি সফলতা প্রক্রিয়া ও উপস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
৬) আইনগত কাঠামো, চুক্তি ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স
অনেক এমএসএমই-এর একটি গোপন দুর্বলতা হলো দুর্বল চুক্তি ও গভর্ন্যান্স। মেন্টরশিপ সহায়তা করে চুক্তি, পেমেন্ট শর্ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অংশীদারিত্ব কাঠামো শক্তিশালী করতে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি ও বিরোধ কমায়।
৭) সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা ও দায়বদ্ধতা
মেন্টরশিপের অন্যতম বড় সুবিধা হলো কাঠামোগত দায়বদ্ধতা। গবেষণায় দেখা যায়, মেন্টরশিপ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পারফরম্যান্স ও সক্ষমতা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়নের ঘাটতি সংশোধনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি আরও পূর্বানুমেয় হয়।
বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যবসার জন্য মেন্টরশিপের প্রয়োজন
বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি বিনিয়োগকারী, ট্রেডিং কোম্পানি ও যৌথ উদ্যোগগুলো সাধারণত ভিন্ন ধরনের মেন্টরশিপ প্রয়োজন অনুভব করে, যেমন বাজারে প্রবেশ কৌশল, স্থানীয় অংশীদার মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো বোঝা, সরবরাহকারী নির্বাচন, বিতরণ চ্যানেল উন্নয়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। বিদেশি ব্যবসার জন্য মেন্টরশিপ মানে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বরং প্রেক্ষাপটভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তবায়ন সহায়তা।
কখন একটি ব্যবসার মেন্টরশিপ নেওয়া জরুরি
যদি বিক্রি বাড়ছে কিন্তু মুনাফা বাড়ছে না, নগদ প্রবাহ সব সময় সংকটে থাকে, মার্কেটিং খরচ থেকে নিয়মিত লিড আসছে না, অপারেশন মালিকনির্ভর হয়ে আছে, ব্যাংক অর্থায়নের জন্য প্রস্তুতি নেই বা রপ্তানি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্রেতার আস্থা তৈরি হচ্ছে না তাহলে মেন্টরশিপ তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য যোগ করতে পারে।
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)-এর ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ সেবা
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB) বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ প্রদান করে, যা উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপারেশন শক্তিশালী করা, বাজারে উপস্থিতি বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানির জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।
এই মেন্টরশিপ সেবার আওতায় সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে ব্যবসায়িক মূল্যায়ন ও প্রবৃদ্ধি রোডম্যাপ, আর্থিক কাঠামো উন্নয়ন, বিক্রয় ও মার্কেটিং সহায়তা, রপ্তানি প্রস্তুতি, অপারেশনাল সিস্টেম উন্নয়ন, ব্যবসা উন্নয়ন ও বিদেশি কোম্পানির জন্য বাজারে প্রবেশ পরামর্শ।
যোগাযোগের তথ্য
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
ওয়েবসাইট: https://tradeandinvestmentbangladesh.com
ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: +৮৮০১৫৫৩৬৭৬৭৬৭
সমাপনী মন্তব্য
বাংলাদেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রচুর, কিন্তু টেকসই ও স্কেলযোগ্য ব্যবসার জন্য কাঠামো অপরিহার্য। ব্যবসায়িক মেন্টরশিপ সম্ভাবনাকে বাস্তব পারফরম্যান্সে রূপান্তরের সবচেয়ে কার্যকর পথ। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এটি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং ব্যয়বহুল ভুল কমায়, আর বিদেশি ব্যবসার জন্য এটি ঝুঁকি কমিয়ে বাস্তবায়নের গতি বাড়ায়।