কীভাবে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণ করতে পারে?
কীভাবে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণ করতে পারে?
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু বছর ধরেই বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রপ্তানি, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে দেশটি বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রবাসী আয়ও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, বাংলাদেশ কেবল বিশ্ববাজারের অংশ নয়, বরং এখন সময় এসেছে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করার।
আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক ব্যবসা আর কেবল বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সহজতর লজিস্টিকস এবং সীমান্ত পেরোনো পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি, বাস্তবসম্মত কৌশল এবং পেশাদার বাস্তবায়ন।
কেন আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ কেবল আয় বৃদ্ধির উপায় নয়; এটি একটি কৌশলগত নিরাপত্তাও। কোনো ব্যবসা যদি শুধুমাত্র দেশীয় বাজার, সীমিত ক্রেতা বা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা, নীতিগত পরিবর্তন বা প্রতিযোগিতার চাপে তা সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ এই ঝুঁকি বিভাজন করতে সাহায্য করে এবং ব্যবসাকে আরও স্থিতিশীল করে তোলে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার আরেকটি বড় সুবিধা হলো অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে মান নিয়ন্ত্রণ, ডকুমেন্টেশন, প্যাকেজিং, সময়মতো ডেলিভারি এবং পেমেন্ট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হয়। এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে কোম্পানির সামগ্রিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ায়, যা দেশীয় বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় একটি কোম্পানি স্থানীয় ব্যাংক, অংশীদার ও মানবসম্পদের কাছে অধিক বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বিদেশে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ইমেজ ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক হতে পারে
বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাধারণত কয়েকটি প্রমাণিত পথে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো সরাসরি রপ্তানি, যেখানে বিদেশি আমদানিকারক বা পরিবেশকের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করা হয়। যেসব কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা স্থিতিশীল এবং মান নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী, তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর পথ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো ডিজিটাল রপ্তানি, যেখানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতা সংগ্রহ করা হয়। এই ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি কোম্পানির অনলাইন উপস্থিতি, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং যোগাযোগের পেশাদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগ, লাইসেন্সিং বা কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে বাজারে প্রবেশের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হলেও সঠিক অংশীদার নির্বাচন এবং আইনি সুরক্ষা অপরিহার্য। বড় বাজারে ধারাবাহিক চাহিদা তৈরি হলে প্রতিনিধি অফিস বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করাও একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে।
আন্তর্জাতিক হওয়ার প্রস্তুতি: রপ্তানির জন্য প্রস্তুত ব্যবসা গড়ে তোলা
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ অনেক সময় পণ্যের দুর্বলতা নয়, বরং প্রস্তুতির অভাব। তাই আন্তর্জাতিক যাত্রার আগে ব্যবসাকে রপ্তানিযোগ্য করে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
প্রথমেই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিজের আন্তর্জাতিক মূল্যপ্রস্তাব স্পষ্ট করতে হবে। বিদেশি ক্রেতা কেন বাংলাদেশি এই কোম্পানিটিকে বেছে নেবে—এই প্রশ্নের উত্তর হতে হবে নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য। কেবল কম দামের কথা বললে চলবে না; বরং মানের ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি, কাস্টমাইজেশন সক্ষমতা, টেকসই উৎস বা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
এরপর পণ্যের প্রস্তুতি প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি পণ্যের লেবেলিং, প্যাকেজিং, ব্যবহার নির্দেশিকা বা নথিপত্রে পরিবর্তন আনতে হয়। পাশাপাশি পণ্যের স্পেসিফিকেশন, টেস্ট রিপোর্ট ও সার্টিফিকেশন সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
অপারেশনাল প্রস্তুতির মধ্যে মান নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা একবারের ভালো নমুনার চেয়ে ধারাবাহিক মানকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা, ট্রেসেবিলিটি এবং সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।
আন্তর্জাতিক হওয়ার ধাপ ও কার্যক্রম
একটি সফল আন্তর্জাতিক যাত্রা সাধারণত ধাপে ধাপে এগোয়। প্রথম ধাপ হলো বাস্তবভিত্তিক বাজার নির্বাচন। আবেগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং আমদানি প্রবণতা, প্রতিযোগিতা, প্রবেশ বাধা এবং পেমেন্ট ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে বাজার বাছাই করতে হয়।
পরবর্তী ধাপে বাজারে প্রবেশের পথ নির্ধারণ করতে হয়। কোনো বাজারে পরিবেশক কার্যকর, কোথাও সরাসরি বড় ক্রেতা বা অনলাইন চ্যানেল বেশি ফলপ্রসূ। পণ্যের ধরন ও কোম্পানির সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এরপর শুরু হয় ক্রেতা অনুসন্ধান ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রথমেই কোম্পানির ওয়েবসাইট, প্রোফাইল ও যোগাযোগ পদ্ধতি দেখে ধারণা তৈরি করে। সুশৃঙ্খল কোটেশন, দ্রুত সাড়া এবং পেশাদার নমুনা ব্যবস্থাপনা এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্ডার পাওয়ার পর রপ্তানি বাস্তবায়ন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। ডকুমেন্টেশন, শিপমেন্ট, সময়সূচি এবং যোগাযোগে ভুল হলে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডেলিভারির পর নিয়মিত ফলোআপ ও সম্পর্ক রক্ষণাবেক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার ভিত্তি তৈরি করে।
সফল আন্তর্জাতিকায়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক বাজারে সফল কোম্পানিগুলো সাধারণত নির্ভরযোগ্যতার জন্য পরিচিত। তারা যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সময়মতো ও নির্দিষ্ট মানে সরবরাহ করে। সমস্যা হলে আগেভাগে জানায় এবং সমাধানে আন্তরিক থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফোকাস। শুরুতেই অনেক পণ্য ও অনেক বাজারে যাওয়ার চেষ্টা না করে একটি শক্তিশালী পণ্য ও একটি নির্দিষ্ট বাজারে সাফল্য অর্জন করাই অধিক ফলপ্রসূ। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও আস্থা বাড়লে পরিসর বিস্তৃত করা যায়।
পেশাদার যোগাযোগ, স্পষ্ট নথিপত্র এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও কমপ্লায়েন্স প্রস্তুতি থাকলে ক্রেতার আস্থা অনেক বেড়ে যায়।
Trade & Investment Bangladesh (T&IB)-এর আন্তর্জাতিকায়ন সহায়তা
অনেক বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ইচ্ছার অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের ফাঁক। সঠিক বাজার নির্বাচন, যোগ্য ক্রেতা খোঁজা, পেশাদার উপস্থাপন এবং ধারাবাহিক ফলোআপ এই জায়গাগুলোতেই বেশিরভাগ উদ্যোগ থেমে যায়।
Trade & Investment Bangladesh (T&IB) আন্তর্জাতিকায়ন প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপ দিতে সহায়তা করে। T&IB ব্যবসাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রস্তুত করতে সহায়তা করে, ডিজিটাল উপস্থিতি শক্তিশালী করা, এক্সপোর্ট মার্কেটিং উপকরণ তৈরি করা এবং পণ্য ও কোম্পানি প্রোফাইল আন্তর্জাতিক মানে উপস্থাপন করা এর অংশ।
এছাড়া T&IB সঠিক বাজার ও ক্রেতা চিহ্নিত করতে, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং এক-টু-এক ব্যবসায়িক বৈঠক আয়োজন করতে সহায়তা করে। প্রাথমিক ডিল সম্পাদনের সময় কোটেশন, ডকুমেন্টেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দিকনির্দেশনা দিয়ে T&IB নতুন রপ্তানিকারকদের ঝুঁকি কমাতে কাজ করে।
এই সমন্বিত সহায়তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ আর বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ থাকে না; বরং এটি একটি কাঠামোবদ্ধ ও টেকসই ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
উপসংহার:
বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক উপস্থিতি শক্তিশালী হলেও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা আরও বড়। আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ মানে শুধু বিদেশে পণ্য পাঠানো নয়; এটি মানসিকতা, প্রক্রিয়া এবং সক্ষমতার রূপান্তর।
যেসব বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত প্রস্তুতি, সঠিক বাজার নির্বাচন এবং পেশাদার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পথে এগোবে, তারা শুধু আয় বাড়াবে না বরং নিজেদের একটি টেকসই, বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পেলে আন্তর্জাতিক বাজার বাংলাদেশের ব্যবসার জন্য একটি স্থায়ী দ্বিতীয় ঘর হয়ে উঠতে পারে।